আলাউদ্দিন আরিফ
|
পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার পরই বিশ্বব্যাংক পুনঃঅর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেবে বলে অর্থমন্ত্রীকে জানিয়েছে বহুজাতিক এই দাতা সংস্থার সফররত দুর্নীতি তদন্ত দল। গতকাল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠকে এই মনোভাবের কথা জানায় বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে তদন্ত দলের বৈঠকের পর বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি অ্যালেন গোল্ডস্টেইন বলেছেন, দুদকের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণ পাওয়ার বিষয়টি। দুর্নীতিতে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া না হলে এবং দুদকের গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক গঠিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ প্যানেল আস্থা প্রকাশ না করলে এ প্রকল্পে অর্থ পাওয়া যাবে না।
গতকাল বিশ্বব্যাংকের তদন্ত দলের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেন, যে প্যানেল এসেছে তারা দেখবেন আমাদের তদন্ত প্রক্রিয়াটি বিশ্বাসযোগ্য ও উন্নত কিনা। যদি তারা দেখে যে, আমাদের তদন্ত প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানের, তখনই আমাদের ‘রি-এনগেজমেন্ট কমপ্লিট’ (পুনঃঅর্থায়নের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত) হবে।
এর আগে গতকাল বিশ্বব্যাংকের গঠিত বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে বৈঠকের পর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন বলেন, দুদকের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা। দুর্নীতিতে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া হলে এবং দুদকের গৃহীত পদক্ষেপের ওপর বিশ্বব্যাংক গঠিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ প্যানেল আস্থা প্রকাশ না করলে এই প্রকল্পে অর্থ পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, দুদককে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই প্রকল্পকে বাস্তবে পরিণত করার বিষয়টি এখন দুদকের হাতে। আমরা আশা করছি, দুদক সফলতার সঙ্গে কাজটি বাস্তবায়ন করবে।
এদিকে দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে কানাডিয়ান পুলিশের কাছ থেকে এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে কানাডার আদালতে করা মামলার এজাহার, আদালতের আদেশের কপি ও সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিষয়ে আরও কিছু নথিপত্র হাতে পেয়েছে দুদক, যা এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দুদকের পুনঃতদন্তে প্রাপ্ত তথ্য, জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও সিডি ও অন্যান্য নথিপত্র তাদের দেয়া হয়েছে। এখন তারা সেগুলো পর্যালোচনা করছেন। তবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংকের প্যানেল চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কমিটির সদস্যরা প্যানেলের অনেক প্রশ্নেরও সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। প্যানেলের সদস্যরা এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে তদন্তের জন্য দুদকের কর্মকর্তাদের উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণ নেয়ার বিষয়েও বলেছেন।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি বিষয়ে দুদকের তদন্ত পর্যবেক্ষণের জন্য অক্টোবরে প্যানেল অব এক্সপার্ট গঠন করে বিশ্বব্যাংক। এই টিমের তিন সদস্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পো, হংকংয়ের দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং ও যুক্তরাজ্যের গুরুতর প্রতারণা দমন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান গত ১৫ অক্টোবর প্রথম দফায় বাংলাদেশে আসেন। ওই সময় দু’বার দুদকের সঙ্গে বৈঠক করে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসার ঘোষণা দিয়ে ফিরে যান। যাওয়ার আগে তারা পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুদকের অনুসন্ধান আবার নতুন করে করার পরামর্শ দিয়ে যান। সে অনুযায়ী গত দেড় মাস ধরে দুদক বিষয়টি আবার তদন্ত করে। গত শনিবার রাতে প্যানেলের তিন সদস্য দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশে আসেন। গতকাল বেলা ৩টা ১০ মিনিটে তারা দুদকের প্রধান কার্যালয়ে যান। এক ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠক শেষে ফিরে যান বেলা ৪টা ২২ মিনিটে। বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যালেন গোল্ডস্টেইন ও বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ বিষয়ক আইন উপদেষ্টা প্রিরানী মালিক। বৈঠকে অনুসন্ধান টিমের চার সদস্য, দুদকের তিন কমিশনার ও কমিশনের আইন উপদেষ্টা অংশ নেন। গতকালের বৈঠকে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্যরা অনুসন্ধান দলের সঙ্গে বেশ কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে তারা আরও কিছু বিষয় বাদ দেয়া ও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিশেষজ্ঞ টিমের দ্বিতীয় দফা আগমনের আগেই যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েছিল দুদক। দ্বিতীয় ধাপে আবার জিজ্ঞাসাবাদে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তার প্রতিবেদনের ইংরেজি ভার্সন ও আনুষঙ্গিক নথিপত্র তৈরি করে রাখা হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদনে অনুসন্ধান টিম দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ১৫ ব্যক্তিকে আসামি হিসেবে শনাক্ত করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন— সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, পদ্মা সেতুর সাবেক প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় ও হুইফ লিটন চৌধুরীর ভাই নিক্সন চৌধুরী, টেন্ডার কমিটির সদস্য সচিব সওজের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী ফেরদৌস, এসএনসি-লাভালিনের স্থানীয় এজেন্ট জিয়াউল হক ও গোলাম মোস্তফা। অনুসন্ধান দল আজ সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করবে। দু-একদিনের মধ্যেই সেটা কমিশনের কাছে পেশ ও সে অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে গতকাল কমিশনের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের বৈঠকের পর বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি অ্যালেন গোল্ডস্টেইন সাংবাদিকদের বলেন, ‘পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি বিষয়ে দুদকের আবার তদন্তের বিষয়ে পর্যবেক্ষণের জন্য এই বৈঠক করেছেন। প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়ার জন্য দুর্নীতির অভিযোগগুলোর অবাধ ও সুষ্ঠু তদন্ত খুবই জরুরি।’ তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত অনুসন্ধান সম্পর্কে আমরা যা জেনেছি, তা উত্সাহব্যঞ্জক। আগামী কয়েক দিনে আমরা আরো কয়েক দফা বৈঠক করব। যদি যথেষ্ট অগ্রগতি দেখা যায়, তাহলে এই সেতু নির্মাণ সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।’
পদ্মা প্রকল্পের বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণে গত সপ্তাহে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর বৈঠকের অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গোল্ডস্টেইন বলেন, ‘কয়েকদিন আগে ম্যানিলায় একটি বৈঠক হয়েছে। সেটা ছিল প্রাথমিক পর্যালোচনা বৈঠক। সেখানে পদ্মা সেতু প্রকল্প আবার কীভাবে শুরু করা যায় সে বিষয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে।’
আপনারা দুদকের তদন্তে সন্তুষ্ট হয়েছেন কিনা এবং অর্থায়ন করতে যাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে গোল্ডস্টেইন বলেন, ‘এটা নির্ভর করছে দুদকের ওপর। দুদককে অবশ্যই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই প্রকল্পকে বাস্তবে পরিণত করার বিষয়টি এখন দুদকের হাতে। আমরা আশা করছি, দুদক সফলতার সঙ্গে কাজটি বাস্তবায়ন করবে।’ বিশ্বব্যাংকের এই প্যানেল ঢাকা ত্যাগের আগে অর্থায়নের বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে গোল্ডস্টেইন বলেন, এটা বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস থেকে পরে জানানো হবে।’
জানা গেছে, গত বুধবার পদ্মা সেতুর অর্থায়নে সম্পৃক্ত বিশ্বব্যাংক ও অপর তিনটি দাতা সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপনের জন্য সর্বাত্মক সহায়তা চাওয়া হয়েছে। ওই সভায় দাতা সংস্থাগুলো সাতটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে এবং সেগুলো মেনে চলার বিষয়ে বাধ্যবাধকতাও আরোপ করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য মতে, ওই শর্ত মানার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অনাপত্তি দেয়া হয়েছে। শর্তের মধ্যে ছিল, সেতু নির্মাণে সর্বত্রই অর্থদাতাদের বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের প্রাধান্য থাকবে।
বিশ্বব্যাংক দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন এবং কার্যাদেশ প্রদানের মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে। তবে এ সংক্রান্ত কমিটিতে বাংলাদেশ সরকারেরও প্রতিনিধি রাখা হবে। দুর্নীতি তদন্তে দুদকের ওপর সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। তদন্ত চলবে সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রক্রিয়ায়। বিশ্বব্যাংক যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে, তার সবই আমলে নেবে সরকার। গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পেলে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে সরকারের আপত্তি থাকবে না।
এদিকে বিশ্বব্যাংকের প্যানেল দুদক কার্যালয় ত্যাগ করার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছেন, ‘আমরা এই ক’দিনে যে কাজ করেছি তার একটি বর্ণনা বিশেষজ্ঞ কমিটিকে দিয়েছি। আমাদের বর্ণনাতে তারা মোটামুটি সন্তুষ্ট হয়েছে। আমাদের অনুসন্ধান কাজ এখনও শেষ হয়নি। সোমবার সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর ‘সাক্ষাত্কার’ আমরা নেব। তাদের সাক্ষাত্কারের পর আমাদের অনুসন্ধান টিম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। তার ভিত্তিতে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থার চিন্তা করব।’
বিশ্বব্যাংকের প্যানেল মামলা বা ত্বরিত কোনো আইনি পদক্ষেপের কথা বলেছে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘মামলা তো হবে যখন অনুসন্ধান টিমের প্রতিবেদনে কারও বিরুদ্ধে অপরাধের বিষয়ে দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যাবে তারপর। অনুসন্ধান প্রতিবেদন বিচার-বিশ্লেষণের আগে এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না।’ বিশ্বব্যাংকের টিম দুদককে কার্যকরভাবে কাজ করতে বলেছে এবং পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন দুদকের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘তারা কার্যকরভাবে বলুক আর যাই বলুক, আমরা পদক্ষেপ নেব আইনানুগ। সেটা সম্ভব হবে কি হবে না, সেটা জানা যাবে অনুসন্ধান প্রতিবেদন পাওয়ার পর।
‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’ তার এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গোলাম রহমান বলেন, “আমরা আগে যে তথ্য পেয়েছি তার ভিত্তিতে ওই কথা বলেছি। এখন সেই তথ্য কতটুকু সঠিক সেটা নিশ্চিত হওয়া যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করার পর। ওইসব ‘কালা’ বিষয়ের পক্ষে প্রমাণাদি পাওয়ার পরই সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
বিশ্বব্যাংক দুদকে অনেক তথ্য দিয়েছে। কিন্তু সেগুলো মামলা করার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘মামলা করার জন্য যে দালিলিক নথিপত্র প্রয়োজন সেটা এখনও পাওয়া যায়নি। বিশ্বব্যাংক যে তথ্য দিয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত তথ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না। আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় যে প্রক্রিয়ায়, সে প্রক্রিয়ায় আমরা তথ্য পাইনি। সেটা পাওয়ার জন্যই পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।’
এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তা রমেশ ও ইসমাইলের বক্তব্য নেয়া হয়নি; এতে অনুসন্ধান অসম্পূর্ণ থাকবে কিনা এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘রমেশ ও ইসমাইলের কোনো বক্তব্য আমরা পাইনি। পরবর্তীতে তদন্তে প্রয়োজন হলে তাদের বক্তব্য নেয়া যাবে। তাদের বক্তব্য নেয়ার জন্য কানাডায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেই চিঠির (এমএলআর) কোনো সন্তোষজনক রিপ্লাই পাওয়া যায়নি।’ অনুসন্ধান চলমান থাকার কথা উল্লেখ করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘দুর্নীতির অনুসন্ধান কখনও শেষ হয় না। সেটা চলমান থাকে। যখনই তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে তখনই সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
দুদকের প্রধান আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির যে অভিযোগ বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পেয়েছি, বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পরামর্শের আলোকে গত ১৮ অক্টোবর থেকে তার একটি ফ্রেশ তদন্ত হয়েছে। আমাদের সময়ের সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা চেষ্টা করেছি দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করার। গত ১৮ অক্টোবর থেকে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। আজও হয়েছে। আগামীকালও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এসবের অগ্রগতি জানার জন্যই তারা এসেছেন। সেই জিজ্ঞাসাবাদের পর ৪ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) আমরা প্যানেলের সঙ্গে পুনরায় বসব। প্রাপ্ত তথ্যাদি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করব।’
প্যানেল মামলা করার কোনো পরামর্শ দিয়েছে কিনা এই প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, মামলা করা না করা সেটা তাদের বিষয় নয়। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে যদি আমাদের আইনে কোনো অপরাধ পাওয়া যায় অবশ্যই মামলা হবে।
আজ সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ সময় বিশেষজ্ঞ প্যানেল থাকবে কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে আনিসুল হক বলেন, সরকারের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে— সেখানে বলা আছে, যাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে প্যানেলের সদস্যরা থাকতে পারবেন। যেহেতু তাদের আগামীকাল (আজ) জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, আর এই দিন তারা দুদকে আসবেন না। আগামী চার তারিখ বেলা ৩টার পর তারা কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
জামিলুর রেজা ও সফিউল্লাকে জিজ্ঞাসাবাদ : পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে মূল্যায়ন কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধরী ও সদস্য বুয়েটের সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আমম সফিউল্লাহকে গতকাল ফের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে অনুসন্ধান টিম। মূল্যায়ন কমিটির অপর সদস্য ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত জলবায়ু সম্মেলনে কাতারের রাজধানী দোহায় থাকায় তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।
জামিলুর রেজা চৌধুরী ও প্রকৌশলী ড. সফিউল্লাহ দুদকের প্রধান কার্যালয়ে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় তাদের কমিশনের ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
অনুসন্ধান টিম সূত্রে জানা গেছে, মূল্যায়ন কমিটির অপর সদস্য ড. আইনুন নিশাতের কাছ থেকে যেসব তথ্য জানা প্রয়োজন সেগুলো ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ও ড. সফিউল্লার কাছ থেকে পাওয়া গেছে। তাই ড. আইনুন নিশাতকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন নেই।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুর দিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ তোলে বিশ্বব্যাংক। সরকারকে দেয়া ওই চিঠির অনুলিপি দুদককেও দেয়া হয়েছে। দুদকের সিনিয়র উপ-পরিচালক আবদুল্লাহ আল জাহিদ ও মীর জয়নুল আবেদিন শিবলীর নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের তদন্ত টিম দুর্নীতির অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন। অনুসন্ধান শেষে এ মাসেই দুদকের টিম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে এবং সে অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক।
দুদক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রস্তাব বিশেষজ্ঞ প্যানেলের : দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে চায় বিশ্বব্যাংক। এ ক্ষেত্রে কমিশনের সম্মতি পাওয়া গেলে বিশ্বব্যাংকের গঠিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হতে পারে।
জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক চলতি বছরের অক্টোবরে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্যানেল গঠন করে। তারা গত ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফরে আসেন। তারা দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের কর্মপদ্ধতি, কর্মকৌশল ও পন্থা বিষয়ে ব্যাপক আপত্তি তোলেন। তারা একটি গাইডলাইন দিয়ে সে অনুযায়ী পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি ফের অনুসন্ধানের পরামর্শ দেন। কিন্তু সে গাইডলাইন অনুযায়ী অনুসন্ধান কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় অনেকটাই আশাহত হয়েছেন প্যানেলের সদস্যরা। তাই তারা দুদকের অনুসন্ধান দলের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় কিছু প্রশিক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন।
কমিশনের সম্মতি পাওয়া গেলে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পো, হংকংয়ের দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং ও যুক্তরাজ্যের গুরুতর প্রতারণা দমন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান এই প্রশিক্ষণ দিতে পারেন।
প্রশিক্ষণ নেয়ার পরামর্শ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক কমিশনার শাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা আমাদের প্রস্তাব করেছেন, দুদক চাইলে তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নও করতে চায় বিশ্বব্যাংক।
পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অনুসন্ধানে ঘাটতি ও অসম্পূর্ণতা থাকায় বিশ্বব্যাংকের প্যানেল এ ধরনের প্রস্তাব করেছে কিনা জানতে চাইলে কমিশনার শাহাবুদ্দীন বলেন—না, ব্যাপারটি ঠিক সে রকম নয়। তারা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এ কাজটি করার জন্য প্রস্তাব করেছেন। বিষয়টি কমিশন ভেবে দেখবে।
গতকাল বিশ্বব্যাংকের তদন্ত দলের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেন, যে প্যানেল এসেছে তারা দেখবেন আমাদের তদন্ত প্রক্রিয়াটি বিশ্বাসযোগ্য ও উন্নত কিনা। যদি তারা দেখে যে, আমাদের তদন্ত প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানের, তখনই আমাদের ‘রি-এনগেজমেন্ট কমপ্লিট’ (পুনঃঅর্থায়নের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত) হবে।
এর আগে গতকাল বিশ্বব্যাংকের গঠিত বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে বৈঠকের পর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন বলেন, দুদকের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা। দুর্নীতিতে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া হলে এবং দুদকের গৃহীত পদক্ষেপের ওপর বিশ্বব্যাংক গঠিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ প্যানেল আস্থা প্রকাশ না করলে এই প্রকল্পে অর্থ পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, দুদককে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই প্রকল্পকে বাস্তবে পরিণত করার বিষয়টি এখন দুদকের হাতে। আমরা আশা করছি, দুদক সফলতার সঙ্গে কাজটি বাস্তবায়ন করবে।
এদিকে দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে কানাডিয়ান পুলিশের কাছ থেকে এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে কানাডার আদালতে করা মামলার এজাহার, আদালতের আদেশের কপি ও সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিষয়ে আরও কিছু নথিপত্র হাতে পেয়েছে দুদক, যা এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দুদকের পুনঃতদন্তে প্রাপ্ত তথ্য, জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও সিডি ও অন্যান্য নথিপত্র তাদের দেয়া হয়েছে। এখন তারা সেগুলো পর্যালোচনা করছেন। তবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংকের প্যানেল চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কমিটির সদস্যরা প্যানেলের অনেক প্রশ্নেরও সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। প্যানেলের সদস্যরা এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে তদন্তের জন্য দুদকের কর্মকর্তাদের উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণ নেয়ার বিষয়েও বলেছেন।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি বিষয়ে দুদকের তদন্ত পর্যবেক্ষণের জন্য অক্টোবরে প্যানেল অব এক্সপার্ট গঠন করে বিশ্বব্যাংক। এই টিমের তিন সদস্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পো, হংকংয়ের দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং ও যুক্তরাজ্যের গুরুতর প্রতারণা দমন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান গত ১৫ অক্টোবর প্রথম দফায় বাংলাদেশে আসেন। ওই সময় দু’বার দুদকের সঙ্গে বৈঠক করে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসার ঘোষণা দিয়ে ফিরে যান। যাওয়ার আগে তারা পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুদকের অনুসন্ধান আবার নতুন করে করার পরামর্শ দিয়ে যান। সে অনুযায়ী গত দেড় মাস ধরে দুদক বিষয়টি আবার তদন্ত করে। গত শনিবার রাতে প্যানেলের তিন সদস্য দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশে আসেন। গতকাল বেলা ৩টা ১০ মিনিটে তারা দুদকের প্রধান কার্যালয়ে যান। এক ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠক শেষে ফিরে যান বেলা ৪টা ২২ মিনিটে। বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যালেন গোল্ডস্টেইন ও বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ বিষয়ক আইন উপদেষ্টা প্রিরানী মালিক। বৈঠকে অনুসন্ধান টিমের চার সদস্য, দুদকের তিন কমিশনার ও কমিশনের আইন উপদেষ্টা অংশ নেন। গতকালের বৈঠকে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্যরা অনুসন্ধান দলের সঙ্গে বেশ কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে তারা আরও কিছু বিষয় বাদ দেয়া ও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিশেষজ্ঞ টিমের দ্বিতীয় দফা আগমনের আগেই যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েছিল দুদক। দ্বিতীয় ধাপে আবার জিজ্ঞাসাবাদে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তার প্রতিবেদনের ইংরেজি ভার্সন ও আনুষঙ্গিক নথিপত্র তৈরি করে রাখা হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদনে অনুসন্ধান টিম দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ১৫ ব্যক্তিকে আসামি হিসেবে শনাক্ত করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন— সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, পদ্মা সেতুর সাবেক প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় ও হুইফ লিটন চৌধুরীর ভাই নিক্সন চৌধুরী, টেন্ডার কমিটির সদস্য সচিব সওজের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী ফেরদৌস, এসএনসি-লাভালিনের স্থানীয় এজেন্ট জিয়াউল হক ও গোলাম মোস্তফা। অনুসন্ধান দল আজ সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করবে। দু-একদিনের মধ্যেই সেটা কমিশনের কাছে পেশ ও সে অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে গতকাল কমিশনের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের বৈঠকের পর বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি অ্যালেন গোল্ডস্টেইন সাংবাদিকদের বলেন, ‘পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি বিষয়ে দুদকের আবার তদন্তের বিষয়ে পর্যবেক্ষণের জন্য এই বৈঠক করেছেন। প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়ার জন্য দুর্নীতির অভিযোগগুলোর অবাধ ও সুষ্ঠু তদন্ত খুবই জরুরি।’ তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত অনুসন্ধান সম্পর্কে আমরা যা জেনেছি, তা উত্সাহব্যঞ্জক। আগামী কয়েক দিনে আমরা আরো কয়েক দফা বৈঠক করব। যদি যথেষ্ট অগ্রগতি দেখা যায়, তাহলে এই সেতু নির্মাণ সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।’
পদ্মা প্রকল্পের বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণে গত সপ্তাহে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর বৈঠকের অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গোল্ডস্টেইন বলেন, ‘কয়েকদিন আগে ম্যানিলায় একটি বৈঠক হয়েছে। সেটা ছিল প্রাথমিক পর্যালোচনা বৈঠক। সেখানে পদ্মা সেতু প্রকল্প আবার কীভাবে শুরু করা যায় সে বিষয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে।’
আপনারা দুদকের তদন্তে সন্তুষ্ট হয়েছেন কিনা এবং অর্থায়ন করতে যাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে গোল্ডস্টেইন বলেন, ‘এটা নির্ভর করছে দুদকের ওপর। দুদককে অবশ্যই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই প্রকল্পকে বাস্তবে পরিণত করার বিষয়টি এখন দুদকের হাতে। আমরা আশা করছি, দুদক সফলতার সঙ্গে কাজটি বাস্তবায়ন করবে।’ বিশ্বব্যাংকের এই প্যানেল ঢাকা ত্যাগের আগে অর্থায়নের বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে গোল্ডস্টেইন বলেন, এটা বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস থেকে পরে জানানো হবে।’
জানা গেছে, গত বুধবার পদ্মা সেতুর অর্থায়নে সম্পৃক্ত বিশ্বব্যাংক ও অপর তিনটি দাতা সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপনের জন্য সর্বাত্মক সহায়তা চাওয়া হয়েছে। ওই সভায় দাতা সংস্থাগুলো সাতটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে এবং সেগুলো মেনে চলার বিষয়ে বাধ্যবাধকতাও আরোপ করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য মতে, ওই শর্ত মানার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অনাপত্তি দেয়া হয়েছে। শর্তের মধ্যে ছিল, সেতু নির্মাণে সর্বত্রই অর্থদাতাদের বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের প্রাধান্য থাকবে।
বিশ্বব্যাংক দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন এবং কার্যাদেশ প্রদানের মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে। তবে এ সংক্রান্ত কমিটিতে বাংলাদেশ সরকারেরও প্রতিনিধি রাখা হবে। দুর্নীতি তদন্তে দুদকের ওপর সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। তদন্ত চলবে সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রক্রিয়ায়। বিশ্বব্যাংক যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে, তার সবই আমলে নেবে সরকার। গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পেলে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে সরকারের আপত্তি থাকবে না।
এদিকে বিশ্বব্যাংকের প্যানেল দুদক কার্যালয় ত্যাগ করার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছেন, ‘আমরা এই ক’দিনে যে কাজ করেছি তার একটি বর্ণনা বিশেষজ্ঞ কমিটিকে দিয়েছি। আমাদের বর্ণনাতে তারা মোটামুটি সন্তুষ্ট হয়েছে। আমাদের অনুসন্ধান কাজ এখনও শেষ হয়নি। সোমবার সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর ‘সাক্ষাত্কার’ আমরা নেব। তাদের সাক্ষাত্কারের পর আমাদের অনুসন্ধান টিম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। তার ভিত্তিতে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থার চিন্তা করব।’
বিশ্বব্যাংকের প্যানেল মামলা বা ত্বরিত কোনো আইনি পদক্ষেপের কথা বলেছে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘মামলা তো হবে যখন অনুসন্ধান টিমের প্রতিবেদনে কারও বিরুদ্ধে অপরাধের বিষয়ে দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যাবে তারপর। অনুসন্ধান প্রতিবেদন বিচার-বিশ্লেষণের আগে এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না।’ বিশ্বব্যাংকের টিম দুদককে কার্যকরভাবে কাজ করতে বলেছে এবং পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন দুদকের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘তারা কার্যকরভাবে বলুক আর যাই বলুক, আমরা পদক্ষেপ নেব আইনানুগ। সেটা সম্ভব হবে কি হবে না, সেটা জানা যাবে অনুসন্ধান প্রতিবেদন পাওয়ার পর।
‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’ তার এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গোলাম রহমান বলেন, “আমরা আগে যে তথ্য পেয়েছি তার ভিত্তিতে ওই কথা বলেছি। এখন সেই তথ্য কতটুকু সঠিক সেটা নিশ্চিত হওয়া যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করার পর। ওইসব ‘কালা’ বিষয়ের পক্ষে প্রমাণাদি পাওয়ার পরই সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
বিশ্বব্যাংক দুদকে অনেক তথ্য দিয়েছে। কিন্তু সেগুলো মামলা করার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘মামলা করার জন্য যে দালিলিক নথিপত্র প্রয়োজন সেটা এখনও পাওয়া যায়নি। বিশ্বব্যাংক যে তথ্য দিয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত তথ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না। আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় যে প্রক্রিয়ায়, সে প্রক্রিয়ায় আমরা তথ্য পাইনি। সেটা পাওয়ার জন্যই পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।’
এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তা রমেশ ও ইসমাইলের বক্তব্য নেয়া হয়নি; এতে অনুসন্ধান অসম্পূর্ণ থাকবে কিনা এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘রমেশ ও ইসমাইলের কোনো বক্তব্য আমরা পাইনি। পরবর্তীতে তদন্তে প্রয়োজন হলে তাদের বক্তব্য নেয়া যাবে। তাদের বক্তব্য নেয়ার জন্য কানাডায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেই চিঠির (এমএলআর) কোনো সন্তোষজনক রিপ্লাই পাওয়া যায়নি।’ অনুসন্ধান চলমান থাকার কথা উল্লেখ করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘দুর্নীতির অনুসন্ধান কখনও শেষ হয় না। সেটা চলমান থাকে। যখনই তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে তখনই সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
দুদকের প্রধান আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির যে অভিযোগ বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পেয়েছি, বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পরামর্শের আলোকে গত ১৮ অক্টোবর থেকে তার একটি ফ্রেশ তদন্ত হয়েছে। আমাদের সময়ের সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা চেষ্টা করেছি দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করার। গত ১৮ অক্টোবর থেকে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। আজও হয়েছে। আগামীকালও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এসবের অগ্রগতি জানার জন্যই তারা এসেছেন। সেই জিজ্ঞাসাবাদের পর ৪ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) আমরা প্যানেলের সঙ্গে পুনরায় বসব। প্রাপ্ত তথ্যাদি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করব।’
প্যানেল মামলা করার কোনো পরামর্শ দিয়েছে কিনা এই প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, মামলা করা না করা সেটা তাদের বিষয় নয়। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে যদি আমাদের আইনে কোনো অপরাধ পাওয়া যায় অবশ্যই মামলা হবে।
আজ সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ সময় বিশেষজ্ঞ প্যানেল থাকবে কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে আনিসুল হক বলেন, সরকারের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে— সেখানে বলা আছে, যাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে প্যানেলের সদস্যরা থাকতে পারবেন। যেহেতু তাদের আগামীকাল (আজ) জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, আর এই দিন তারা দুদকে আসবেন না। আগামী চার তারিখ বেলা ৩টার পর তারা কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
জামিলুর রেজা ও সফিউল্লাকে জিজ্ঞাসাবাদ : পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে মূল্যায়ন কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধরী ও সদস্য বুয়েটের সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আমম সফিউল্লাহকে গতকাল ফের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে অনুসন্ধান টিম। মূল্যায়ন কমিটির অপর সদস্য ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত জলবায়ু সম্মেলনে কাতারের রাজধানী দোহায় থাকায় তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।
জামিলুর রেজা চৌধুরী ও প্রকৌশলী ড. সফিউল্লাহ দুদকের প্রধান কার্যালয়ে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় তাদের কমিশনের ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
অনুসন্ধান টিম সূত্রে জানা গেছে, মূল্যায়ন কমিটির অপর সদস্য ড. আইনুন নিশাতের কাছ থেকে যেসব তথ্য জানা প্রয়োজন সেগুলো ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ও ড. সফিউল্লার কাছ থেকে পাওয়া গেছে। তাই ড. আইনুন নিশাতকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন নেই।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুর দিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ তোলে বিশ্বব্যাংক। সরকারকে দেয়া ওই চিঠির অনুলিপি দুদককেও দেয়া হয়েছে। দুদকের সিনিয়র উপ-পরিচালক আবদুল্লাহ আল জাহিদ ও মীর জয়নুল আবেদিন শিবলীর নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের তদন্ত টিম দুর্নীতির অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন। অনুসন্ধান শেষে এ মাসেই দুদকের টিম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে এবং সে অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক।
দুদক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রস্তাব বিশেষজ্ঞ প্যানেলের : দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে চায় বিশ্বব্যাংক। এ ক্ষেত্রে কমিশনের সম্মতি পাওয়া গেলে বিশ্বব্যাংকের গঠিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হতে পারে।
জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক চলতি বছরের অক্টোবরে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্যানেল গঠন করে। তারা গত ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফরে আসেন। তারা দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের কর্মপদ্ধতি, কর্মকৌশল ও পন্থা বিষয়ে ব্যাপক আপত্তি তোলেন। তারা একটি গাইডলাইন দিয়ে সে অনুযায়ী পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি ফের অনুসন্ধানের পরামর্শ দেন। কিন্তু সে গাইডলাইন অনুযায়ী অনুসন্ধান কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় অনেকটাই আশাহত হয়েছেন প্যানেলের সদস্যরা। তাই তারা দুদকের অনুসন্ধান দলের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় কিছু প্রশিক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন।
কমিশনের সম্মতি পাওয়া গেলে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পো, হংকংয়ের দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং ও যুক্তরাজ্যের গুরুতর প্রতারণা দমন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান এই প্রশিক্ষণ দিতে পারেন।
প্রশিক্ষণ নেয়ার পরামর্শ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক কমিশনার শাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা আমাদের প্রস্তাব করেছেন, দুদক চাইলে তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নও করতে চায় বিশ্বব্যাংক।
পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অনুসন্ধানে ঘাটতি ও অসম্পূর্ণতা থাকায় বিশ্বব্যাংকের প্যানেল এ ধরনের প্রস্তাব করেছে কিনা জানতে চাইলে কমিশনার শাহাবুদ্দীন বলেন—না, ব্যাপারটি ঠিক সে রকম নয়। তারা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এ কাজটি করার জন্য প্রস্তাব করেছেন। বিষয়টি কমিশন ভেবে দেখবে।


0 comments:
Post a Comment