মন্তব্য প্রতিবেদন : মান-মর্যাদা আর রইল না

মাহমুদুর রহমান
     
57
গত সপ্তাহে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকে এবং বিএনপির নৈতিক সমর্থনে দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। মহাজোট সরকারের চার বছরের ডজন খানেক হরতালের মধ্যে এটাই সবচেয়ে সহিংস ছিল। অবশ্য এই সপ্তাহের অবরোধে আরও রক্ত ঝরেছে। তবে আজকের লেখায় অবরোধ প্রসঙ্গ বাদ রাখছি। হরতালকারীদের পিকেটিংয়ে স্বতঃস্ফূর্ততা এবং অধিক মাত্রায় অংশগ্রহণের কারণেও জামায়াতের হরতালটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। দু’ সপ্তাহ আগে লেখা ‘দেয়াল লিখন পড়ুন’ শিরোনামের মন্তব্য প্রতিবেদনে জামায়াত এবং শিবির কর্মীদের দলীয় আদর্শের প্রতি আনুগত্য এবং লড়াকু মনোভাবের প্রশংসা করেছিলাম। হরতালের দিনে পুলিশ ও সরকারি ক্যাডার বাহিনীর যৌথ হামলা প্রতিরোধে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের সাহস করে রাজপথে অবস্থান ধরে রাখার দৃশ্য এখন সর্বত্র আলোচনার বিষয়। হরতাল ডেকে ঘরে বসে কিংবা মোবাইল বন্ধ করে নিরাপদ দূরত্বে থাকার ভীরুতার বিপরীতে সাহসের এই প্রদর্শনী ফ্যাসিস্ট সরকারের লাঠিয়াল প্রশাসনকে দৃশ্যতই বিচলিত করে তুলেছে। সেই হরতালের রাতে বাংলাভিশনের টক শোতে এই মুহূর্তে সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘টকশো স্টার’ নিউ-এজ সম্পাদক নুরুল কবির এসেছিলেন। আলট্রা-সেক্যুলার এই সম্পাদক কট্টর জামায়াত-বিরোধী হয়েও সে রাতে দেশব্যাপী হরতালের সফলতা স্বীকার করে নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ক্রমবর্ধমান সাংগঠনিক সক্ষমতায় তার বামপন্থী অবস্থান থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো দিনাজপুরে একজন শিবির কর্মীর অমূল্য প্রাণ এবং হাজারের ওপর কর্মী-সমর্থকদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের বিনিময়ে প্রাপ্ত সারাদিনের রাজনৈতিক সফলতা জামায়াত নেতৃবৃন্দ রাতে অপ্রত্যাশিতভাবে বিদেশি মনিবের পদতলে বিসর্জন দিয়েছেন। ঘটনাটি এ রকম।
সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলাকালে রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় মার্কিন দূতাবাসের একটি গাড়ি পিকেটারদের সামনে পড়লে তারা গাড়ি লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়ে। চালক গাড়িটি দ্রুত চালিয়ে নিতে সক্ষম হলেও জানালার কাঁচ ভেঙে যায় এবং চালকও সামান্য আহত হয়। একটি চলন্ত গাড়িকে মার্কিন দূতাবাসের বলে চেনা নিশ্চয়ই পিকেটারদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সুতরাং, এখানে বিশেষভাবে মার্কিন-বিরোধী কোনো মনোভাব প্রকাশ পাওয়ার সুযোগও ছিল না। কিন্তু, তা সত্ত্বেও ভীত-সন্ত্রস্ত জামায়াতে ইসলামী, রীতিমত আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশের মাধ্যমে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। সেই বিবৃতিতে ঘটনার দায়দায়িত্ব দলের কাঁধে নিয়ে তারা ক্ষতিপূরণ প্রদানেরও প্রস্তাব দেয়। এখন প্রশ্ন হলো, ওইদিন সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত শ’খানেক গাড়ি অগ্নিসংযোগ এবং ভাংচুরের শিকার হয়েছে। তাহলে কেবল মার্কিন দূতাবাসের গাড়ি ভাংচুরের জন্য জামায়াতে ইসলামীর দুঃখ প্রকাশ এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রস্তাবের পেছনে যৌক্তিকতা কোথায়? শুধু তাই নয়। একটি বিশেষ গাড়ি ভাংচুরের দায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে গ্রহণ করে দলীয়ভাবে জামায়াতে ইসলামী হরতালের দিনে সংঘটিত তাবত্ সহিংসতার দায়-দায়িত্ব কি নিজেদের ঘাড়ে নেয়নি? আনুষ্ঠানিক সেই স্বীকারোক্তির সুযোগ নিয়ে সরকার এর মধ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত আমির এবং সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করে দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অন্যান্য গ্রেফতারকৃত নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে গাড়ি ভাংচুরের অপরাধে ফৌজদারি মামলা দায়ের হলে তাদের পক্ষের আইনজীবীরা মক্কেলকে মুক্ত করতে কী যুক্তির সহায়তা নেবেন সেটা তারাই ভালো জানেন। তবে মার্কিন তোষণের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী যে তাদের আদর্শিক অবস্থান দুর্বল করে ফেলেছে এ বিষয়টি আশা করি, দলটির বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন কর্মী-সমর্থকরা মানবেন। প্রসঙ্গক্রমে অন্য একটি বিষয়ের অবতারণা করছি।
আমার সর্বশেষ মন্তব্য-প্রতিবেদনে মিসরের ইখওয়ানুল মুসলেমিন (মুসলিম ব্রাদারহুড)-এর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির কিছু সমালোচনা করেছিলাম। সেই সমালোচনায় দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকের একাংশ ব্যথিত হয়ে আমার দেশ পত্রিকা এবং সোনার বাংলাদেশ ওয়েবসাইটে প্রশ্ন আকারে বিভিন্ন মন্তব্য লিখেছেন। ইখওয়ানুল মুসলেমিন এবং জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি অভিন্ন দাবি করে তারা জানতে চেয়েছেন, কোন পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি ভ্রান্ত বলে আমি মন্তব্য করেছি। আমি ধরে নিচ্ছি জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মীরা হাসান-আল-বান্না, সৈয়দ কুতুব এবং জয়নাব গাজ্জালীর বইপত্র আমার চেয়ে অনেক বেশি পড়েছেন। মিসরের ইসলামী দলটির ইতিহাস সম্পর্কেও তাদের জানাশোনা অনেক বেশি। পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে মিসরের এক সময়ের জনপ্রিয় নেতা জামাল আবদেল নাসেরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ইখওয়ানুল মুসলেমিনের সংগ্রামে পশ্চিমা বিশ্বের এক প্রকার কৌশলগত সমর্থন ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত নাসের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত সব গোষ্ঠীকেই ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের পশ্চিমা মিত্ররা সে সময় বন্ধু বিবেচনা করত। ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ নীতি সবাই সময়-সুযোগ মতো গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু, ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ (Yom Kippur War) মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির দৃশ্যপট পাল্টে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের একাধিপত্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের দিকে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করে। মিসরের প্রেসিডেন্ট সেই সময় ইসরাইল সফর করে সারা বিশ্বকে চমকে দেন এবং দেশবাসীকে তার বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করে তোলেন। এই ইসরাইল প্রীতির প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তী সময়ে সামরিক প্যারেড চলাকালে আনোয়ার সাদাত বিদ্রোহী সেনার গুলিতে নিহত হলে তার উত্তরসূরি হোসনি মোবারক অধিকতর মার্কিন ঘেঁষা নীতি অনুসরণ করেন।
উপর্যুপরি তিন স্বৈরশাসকের পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময়ের শাসনকাল ইখওয়ানুল মুসলেমিনকে নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই অতিবাহিত করতে হয়েছে। শত শত নিরাপরাধ নারী-পুরুষকে কেবল ইসলামী আদর্শ ধারণ করার অপরাধে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। এমন সময়ও গেছে, যখন মিসরে প্রকাশ্যে ইখওয়ানুল মুসলেমিন শব্দটি উচ্চারণ করা পর্যন্ত অপরাধ রূপে গণ্য হতো। দলের সদস্যদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে সরকারের ছদ্মবেশী এজেন্টরা সর্বত্র ঘুরে বেড়াত। এত নির্যাতন সত্ত্বেও মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃবৃন্দ কখনই মিসরের জনগণের স্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে কোনো অবস্থান গ্রহণ করেননি অথবা নীতি বিসর্জন দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে কোনো আপসরফা করেননি। আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার পরিণতিতেই ছয় দশকের দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে দলটি গণআন্দোলনের জোয়ারে সম্প্রতি রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ করেছে। তবে প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে মোবারকপন্থীদের আন্দোলন থেকে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, মিসরে ইসলামী শক্তির বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার দেশটিতে আরব বসন্তের জাগরণ স্থায়ী রূপ পেতে হয়তো আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
অপরদিকে ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলাম তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে যে পর্বতপ্রমাণ ভুল করেছে আজ তার মূল্য না চুকিয়ে উপায় নেই। পাকিস্তানের জালিম শাসকদের পক্ষাবলম্বন ইসলামের মহান আদর্শের পরিপন্থী কাজ হিসেবে অবশ্যই সবাইকে মানতে হবে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে দখলদার বাহিনী গণহত্যা আরম্ভ করার পর স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করার নীতির পক্ষে কোনো যুক্তি প্রদর্শনের সুযোগ নেই। ১৯৮৬ সালে জেনারেল এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ, ১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে জয়লাভ করাতে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান এবং ২০০৭ সালে সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়াও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভুলের ধারাবাহিক উদাহরণ। আশঙ্কা করছি, গত সপ্তাহের হরতালে মার্কিন দূতাবাসের সামান্য গাড়ি ভাংচুরে নতজানু প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দলটি পুনরায় ভুলের ফাঁদে পা দিয়েছে। সেক্যুলারের ছদ্মাবরণে একটি ইসলাম বিদ্বেষী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের রক্ষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করুণা ভিক্ষার প্রচেষ্টা কোনো ইসলামী দলের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে না। এই পদক্ষেপ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয়, প্রকৃত ইসলামপন্থী জনগণের মান-মর্যাদার হানি ঘটিয়েছে। আমার মন্তব্যে দলটির নেতা-কর্মী, সমর্থকরা আবারও আহত বোধ করলেও আমি নাচার। অকপটে সত্য কথা বলার জন্যই মইন-ফখরুদ্দীনের ক্ষমতা দখলের প্রতিবাদে ২০০৭ সালে অপটু হাতে কলম তুলে নিয়েছিলাম। ক্ষমতাবানদের সঙ্গে আঁতাত না করে চলার জন্য পরিবারসহ আমাকে অনেকভাবে মূল্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। তবু, আদর্শচ্যুত হয়ে নিজের পিঠ বাঁচানোর কৌশল নিতে আমি রাজি নই।
মান-মর্যাদার প্রশ্নে এবারের বিজয়ের মাস নিয়ে খানিক আলোচনা করা যাক। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়ার সুবাদে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ নিজেদের বাংলাদেশের মালিক রূপে যে বিবেচনা করে থাকেন সে বিষয়টি সংসদে সরকারি দলের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী স্পষ্ট করেই বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সোল এজেন্সির দাবিদারদের প্রকাশ্যে দেশের মালিকানা দাবি করার বিষয়টি সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র। আমি সর্বদাই বলে এসেছি, আওয়ামী লীগ একটি আপাদমস্তক ফ্যাসিবাদী দল। সাজেদা চৌধুরীর বক্তব্যের মাধ্যমে দলটি সম্পর্কে আমার এতদিনের মূল্যায়ন নতুনভাবে প্রমাণিত হয়েছে। গত সাতদিন ধরে টেলিভিশনে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এবং দলীয় বুদ্ধিজীবীকুলের কাছ থেকে নানারকম জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। তাদের বক্তব্যে একটি লক্ষণীয় মিল খুঁজে পেয়েছি। সবাই একবাক্যে বলেছেন, বিজয়ের মাসে হরতাল আহ্বান করে জামায়াতে ইসলাম রীতিমত কবিরা গোনাহ্ করে ফেলেছে। দেশের স্বঘোষিত মালিকরা তাদের জীবিত রেখেছে এতেই জামায়াতে ইসলামীর কোটির অধিক কর্মী-সমর্থকের কৃতার্থ থাকা উচিত। বিজয়ের মাসে সেই দলের হরতাল ডাকার ধৃষ্টতায় আওয়ামী মহলের সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেছে। মিরপুরে পুলিশ প্রহরায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের বীর পুঙ্গবদের শিবির কর্মীদের গণপিটুনি দেয়ার দৃশ্য থেকেও তাদের ক্রোধের মাত্রা বেশ বোঝা গেছে। টেলিভিশনে সেদিনের দৃশ্য ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার তাণ্ডবের দৃশ্য স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। বিএনপির গত রোববারের অবরোধের দিনেও আওয়ামী ক্যাডারদের একই ভূমিকায় দেখা গেছে। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে এই বিজয়ের মাসেই জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র ধারক-বাহকের দাবিদার আওয়ামী লীগ ৭২ ঘণ্টার লাগাতার হরতাল দিয়েছিল। তবে কীনা শ্রীকৃষ্ণের জন্য যেটা লীলাখেলা, আমজনতার জন্য সেটাই গুরুতর অপরাধ। জামায়াতে ইসলামীকে মোকাবেলার কৌশল পাল্টে আওয়ামী লীগ তাদের এক সময়ের তাবত্ বি-টিমকে এবার মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৯৭৫ সালের ফ্যাসিস্ট বাকশালের সঙ্গী-সাথীরা সবাই অবশেষে ঘোমটা খুলে একজোট হচ্ছেন। এদেরকে লক্ষ্য করেই বিশিষ্ট সমাজচিন্তক ও বাম রাজনীতির তাত্ত্বিক বদরুদ্দিন উমর বাকশালের গর্ভে জন্ম নেয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি নিয়ে বাকশালের সব প্রেতাত্মা আগামী ১৮ তারিখে হরতালের ডাক দিয়েছে। যাই হোক, ১৬ কোটি মানুষের মাতৃভূমির স্বঘোষিত মালিক-মোক্তাররা বিজয়ের মাসে দেশবাসীর জন্য কী কী প্রকার উপহারের বন্দোবস্ত রেখেছেন জাতির মান-মর্যাদাবিষয়ক আলোচনায় তার দিকে খানিক দৃষ্টিপাত করি।
এ মাসের ৫ তারিখে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ২০১২ সালের বিশ্ব দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের গত এক বছরে দুর্নীতির ভয়াবহ বিস্তারের ফলে প্রত্যাশিতভাবেই আমাদের অবস্থানের ২৪ ধাপ অবনমন ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছি। আফগানিস্তানসহ এ অঞ্চলের সাতটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়া কেবল পাকিস্তানের ৫ ধাপ অবনতি হয়েছে। শুধু তাই নয়। দুর্নীতির হিসাব কষার যে স্কোর পদ্ধতি রয়েছে তাতেও আমরা গত বছরের তুলনায় ১ নম্বর কম পেয়েছি। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র দখলদার ন্যাটো সেনাবাহিনী কবলিত আফগানিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশেরই স্কোর অন্তত কমেনি। এ বছর ১০০ নম্বরের মধ্যে আমরা পেয়েছি সাকুল্যে ২৬। কথিত সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির কল্যাণে দেশে গোল্ডেন জিপিএ এবং জিপিএ-৫ এর ছড়াছড়ি চললেও দুর্নীতির পরীক্ষায় আমাদের অবস্থা ‘এফ’ অর্থাত্ ফেলের চেয়েও খারাপ। দুর্নীতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় চ্যাম্পিয়নশিপ করায়ত্ত করার পর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের তকমা পুনরুদ্ধার করতেও আর বোধহয় খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। এই অপমানের মনোবেদনা কমানোর ব্যর্থ চেষ্টায় একটা হালকা গল্প বলি। যেসব পাঠক গল্পটি জানেন নিজ গুণে লেখককে ক্ষমা করবেন। বার্ষিক পরীক্ষায় ফল প্রকাশের দিনে ছেলে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরেছে। পিতা অবস্থা বুঝতে পেরে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘কী ফেল করেছো তো?’ ছেলের কান্না আরও বেড়ে গেল। কোনোক্রমে জবাব দিল, ‘ফেল করলে তো ভালোই ছিল, আমাকে আরও এক ক্লাস নিচে নামিয়ে দিয়েছে।’ আমাদের অবস্থাও ওই ফেল করা ছেলের মতোই। সর্বব্যাপী অবক্ষয়ে জাতি হিসেবে আর কত নিচে নামতে হবে তারই হদিস করতে পারছি না। দুর্নীতির আলোচনায় ফিরে আসি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক বিশ্বব্যাপী দুর্নীতি সূচক প্রকাশিত হওয়ার দিনটিতে পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতি তদন্তে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক গঠিত বিশেষজ্ঞ দল ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। মন্ত্রী পর্যায়ের প্রমাণিত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের নিয়ে দুদকের সঙ্গে মতান্তর ঘটায় সে রাতেই তারা অত্যন্ত রুষ্ট হয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে গেছেন। দুদক কর্তৃক নিয়োজিত অনুসন্ধান টিম সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন এবং প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় নিক্সন চৌধুরীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দিলেও উপরের চাপে দুদক চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়কে বাদ দিয়ে মামলা করার প্রস্তাব করেন। সঙ্গত কারণেই উপর মহলের দুর্নীতিকে উত্সাহ প্রদানকারী এই অন্যায় প্রস্তাবে বিশ্বব্যাংক সম্মত হয়নি। আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর দুদক কার্যালয় ত্যাগের আগে বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক চিফ প্রসিকিউটর লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পো দৃশ্যত বিরক্তির সঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, আর কিছু বলার নেই, আমরা বিমানবন্দরে যাচ্ছি। আর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আজ্ঞাবহ দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান মন্তব্য করেন, ‘মামলা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী হবে, অনুসন্ধান কমিটি যে প্রতিবেদন দিয়েছে সেটা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। এতে কিছুদিন সময় লাগলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।’ এই ঘটনায় মহাভারত অশুদ্ধ না হলেও দক্ষিণের মানুষের অনেক স্বপ্নের পদ্মা সেতু প্রকল্পের কফিনে শেষ পেরেক যে মারা হয়ে গেল এই সহজ কথাটি মেরুদণ্ডহীন, দলবাজ আমলাটিকে কে বোঝাবে? তাছাড়া মামলা দায়েরের মাধ্যমে জাতির ললাটে দুর্নীতিবাজের সিল খানিকটা হলেও মোছার একটা সুযোগ হাতছাড়া করার দায় সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনকেও গ্রহণ করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংক প্রধান এক বিবৃতি প্রকাশ করে বলেছেন যে, দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত ব্যতিরেকে তারা পদ্মা সেতুতে আর অর্থায়ন করবেন না। অর্থাত্ দশ মণ ঘিও পুড়বে না, রাধাও নাচবে না। দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর প্রমাণিত দুর্নীতি প্রসঙ্গে গোলাম রহমান কিছুদিন আগে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, পিওন-ড্রাইভারের সাক্ষীতে তো আর মামলা হয় না। মনে প্রশ্ন জাগছে, ক্ষমতার পালাবদল সাপেক্ষে দুদক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে দুর্নীতিতে সহায়তা প্রদান ও দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি করার অভিযোগে মামলা হলে, তার সাক্ষী কারা হবেন? মোদ্দা কথা, শেখ হাসিনা এবারের বিজয়ের মাসকে দুর্নীতির মাসে পরিণত করেছেন।
বাঙালিরা স্বভাবগতভাবেই আবেগপ্রবণ জাতি। প্রতি বছর বিজয়ের মাস এলে আমাদের সেই আবেগ বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো সব পরিমিতিবোধকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ভাষা আন্দোলনের মাস এবং স্বাধীনতার মাসেও যে কোনো বিদেশি পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে এলে একই চিত্র দেখতে পাবেন। আর দল হিসাবে আওয়ামী লীগ তো দেশের মালিকানা দাবি করার পাশাপাশি ফেব্রুয়ারি, মার্চ, আগস্ট এবং ডিসেম্বর এই চার মাস রীতিমত দখল করে বসে আছে। সম্ভব হলে আওয়ামী পন্থীরা চার মাসে সব ভিন্ন মতাবলম্বীর জন্য বাংলাদেশে অবস্থান নিষিদ্ধ করে দিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সোল এজেন্সির দাবিদার সেই দল এবারের বিজয়ের মাসেই দেশের প্রতিটি নাগরিকের মান-মর্যাদা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। দুর্নীতি সূচকের ভয়াবহ অবনতি ঘটার সংবাদের পাশাপাশি পদ্মা সেতু ডোবানো হয়েছে এই বিজয়ের মাসেই। সুশাসন শিকেয় তুলে কেবল মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের গল্প ফেরি করে দেশ পরিচালনা করার নীতি মেয়াদের শেষ বছরে ক্ষমতাসীনদের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে। অবশ্য ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব প্রিয় প্রধানমন্ত্রী এখানেও ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো শেখ হাসিনার যে কোনো বক্তব্য তা যতই অযৌক্তিক হোক না কেন সমস্বরে তার প্রচারণায় নেমে যাওয়া। আমি একেবারেই অবাক হব না যদি আমাদের অতিকথন প্রিয় প্রধানমন্ত্রী ডিসেম্বর মাসে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন প্রকাশ এবং বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ দলের পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি তদন্তে ঢাকা আগমনের সঙ্গে স্বাধীনতা বিরোধিতা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের প্রচেষ্টার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পান।
লন্ডনের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দি ইকোনমিস্ট’ তথাকথিত ‘আন্তর্জাতিক’ ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারপতির টেলিসংলাপের দলিল-দস্তাবেজ জেনে যাওয়ার পর এমনিতেই বাংলাদেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থাই বিশ্ব জনমতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী পুত্রের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের সংবাদ এবং এদেশের বিচার বিভাগের সার্বিক অবক্ষয়ের কাহিনী প্রকাশ করেই আমার দেশ সরকারের রোষানলে পতিত হয়েছিল। পত্রিকার একজন সম্পাদক ও কলামিস্ট হিসেবে সেই ঘটনার ৩ বছর পর মাথা উঁচু করে দাবি করতে পারি যে আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত সব সংবাদ এবং আমার প্রতিটি কলামের বস্তুনিষ্ঠতা আজ প্রমাণিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্রোধে অন্ধ হয়ে আদালত ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে আমাদের কন্ঠরোধের যাবতীয় চেষ্টা গ্রহণের পরিবর্তে সেই সময় সততা ও সুশাসনের পথে ফিরে এলে আজ তাকে হয়তো এই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো না। বাংলাদেশের মান-মর্যাদাও অক্ষুণ্ন থাকত। সর্বক্ষণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে যারা মুখে ফেনা তুলে ফেলেন, তাদের উদ্দেশ্য করে বলতে চাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অর্থ কোনো ব্যক্তি অথবা দলের স্তাবকে পরিণত হয়ে তাদের পূজা করা নয়। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা, দল-মত জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দেশের সম্পদ সাধারণ জনগোষ্ঠীর মাঝে সুষমভাবে বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার বাস্তবায়ন সম্ভব। বলদর্পী, ক্ষমতান্ধ, দুর্নীতিপরায়ণ মহাজোট সরকার গত ৪ বছরে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভিত্তিমূল দুর্বল করে ফেলেছে। এদের কাছ থেকে পরিত্রাণ ভিন্ন এদেশে একবিংশ শতকের উপযোগী একটি আধুনিক, গণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ফ্যাসিস্ট শাসকদের হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় দেশের ঐক্যবদ্ধ জনগণকেই খুঁজে নিতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা ভারতের মুখাপেক্ষী হয়ে আমরা প্রকৃত সার্বভৌম, জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পারব না। আসুন, নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করে দুর্নীতিবাজ, অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীকে পরাজিত করার সংগ্রামে এই মহান বিজয়ের মাসে সংকল্পবদ্ধ হই। তাহলেই কেবল আমাদের হারিয়ে যাওয়া মান-মর্যাদা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শনে সক্ষম হব।
পুনশ্চ : বিজয়ের মাসে আমাদের লড়াকু ক্রিকেটাররা দেশের মান-মর্যাদা কেবল বৃদ্ধিই করেনি, চার বছরের দুঃশাসনে ম্রিয়মাণ জাতিকে খানিকক্ষণের জন্য হলেও ঐক্যবদ্ধভাবে আনন্দের জোয়ারে অবগাহন করার সুযোগ করে দিয়েছে। তাদের আমার প্রাণঢালা অভিনন্দন।
ই-মেইল : admahmudrahman@gmail.com


ছাত্রলীগের সন্দেহ-রোষে প্রাণ গেল পথচারীর

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি | তারিখ: ০৯-১২-২০১২
  • স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়ে আছে বিশ্বজিৎ দাসের নিথর লাশ। পুরান ঢাকার জজ কোর্ট
    স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়ে আছে বিশ্বজিৎ দাসের নিথর লাশ। পুরান ঢাকার জজ কোর্ট এলাকায় আজ সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ ছাত্রলীগের হামলায় নিহত হন তিনি।
    ছবি: হাসান রাজা।
  • ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের সমর্থিত আইনজীবীদের মিছিল লক্ষ্য করে জগন্নাথ বিশ্�
    ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের সমর্থিত আইনজীবীদের মিছিল লক্ষ্য করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ ছাত্রলীগের ধাওয়া।
    ছবি: হাসান রাজা।
  • ধাওয়া খেয়ে একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে আশ্রয় নেওয়ার পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিশ্বজিৎ দাসকে কোপাচ��
    ধাওয়া খেয়ে একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে আশ্রয় নেওয়ার পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিশ্বজিৎ দাসকে কোপাচ্ছে ছাত্রলীগের এক কর্মী।
    ছবি: হাসান রাজা।
  • বিশ্বজিৎ দাসকে কোপানো শেষে ডেন্টাল ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে আসছেন চাপাতি হাতে ছাত্রলীগের কর্মী।
    বিশ্বজিৎ দাসকে কোপানো শেষে ডেন্টাল ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে আসছেন চাপাতি হাতে ছাত্রলীগের কর্মী।
    ছবি: হাসান রাজা।
  • ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তাত বিশ্বজিকে পেটাচ্ছে ছাত্রলীগের কর্মী।
    ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তাত বিশ্বজিকে পেটাচ্ছে ছাত্রলীগের কর্মী।
    ছবি: হাসান রাজা।
  • ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তাত বিশ্বজিকে পেটাচ্ছে ছাত্রলীগের কর্মী।
    ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তাত বিশ্বজিকে পেটাচ্ছে ছাত্রলীগের কর্মী।
    ছবি: হাসান রাজা।
  • ছাত্রলীগের কর্মীদের হামলা থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন বিশ্বজিৎ।
    ছাত্রলীগের কর্মীদের হামলা থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন বিশ্বজিৎ।
    ছবি: হাসান রাজা।
  • নিহত বিশ্বজিতের স্বজনের আহাজারি।
    নিহত বিশ্বজিতের স্বজনের আহাজারি।
    ছবি: হাসান রাজা।
1 2 3 4 5 6 7 8
রাজধানীর পুরান ঢাকার জজ কোর্ট এলাকায় আজ রোববার সকালে ছাত্রদলকর্মী সন্দেহে ছাত্রলীগের কর্মীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এক পথচারী নিহত হয়েছেন। তাঁর নাম বিশ্বজিত্ দাস (২৪)।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ১৮ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির সমর্থনে আজ সকাল সোয়া নয়টার দিকে ঢাকা জজ কোর্ট এলাকা থেকে বিএনপি-জামায়াতের সমর্থিত আইনজীবীরা একটি মিছিল নিয়ে ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে গেলে একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আইনজীবীদের ধাওয়া করেন। ধাওয়া খেয়ে পথচারী বিশ্বজিত্ দাস দৌড়ে সেখানকার একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে আশ্রয় নেন। তখন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় বিশ্বজিেক এক রিকশাচালক পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কর্তব্যরত চিকিত্সক বিশ্বজিেক মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর লাশ হাসপাতালের মর্গে রাখা আছে।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার আবু তানভীর সিদ্দিক বলেন, বিশ্বজিেক গুরুতর অবস্থায় এক রিকশাচালক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। প্রচুর রক্ষক্ষরণের কারণে ১০ মিনিটের মাথায় মারা যান তিনি।
নিহত ব্যক্তির বড় ভাই উত্তম কুমার দাস প্রথম আলো ডটকমকে জানিয়েছেন, ৫৩ নম্বর ঋষিকেশ দাস লেনের বাসা থেকে আজ সকালে শাঁখারীবাজারে তাঁর টেইলার্সের দোকানে যাচ্ছিলেন বিশ্বজিত্। ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় ছাত্রদলের কর্মী মনে করে ছাত্রলীগের কর্মীরা তাঁকে কুপিয়েছে। বিশ্বজিত্ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলেও তিনি দাবি করেন।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করে দুপুর দুইটা পর্যন্ত পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

A blood test to determine how fast someone is ageing has been shown to work on a population of wild birds, the first time the ageing test has been used successfully on animals living outside a laboratory setting.
Click graphic to enlarge
The test measures the average length of tiny structures on the tips of chromosomes called telomeres which are known to get shorter each time a cell divides during an organism’s lifetime.
Telomeres are believed to act like internal clocks by providing a more accurate estimate of a person’s true biological age rather than their actual chronological age.
This has led some experts to suggest that telomere tests could be used to estimate not only how fast someone is ageing, but possibly how long they have left to live if they die of natural causes.
Telomere tests have been widely used on experimental animals and at least one company is offering a £400 blood test in the UK for people interested in seeing how fast they are ageing based on their average telomere length.
Now scientists have performed telomere tests on an isolated population of songbirds living on an island in the Seychelles and found that the test does indeed accurately predict an animal’s likely lifespan.
“We saw that telomere length is a better indicator of life expectancy than chronological age. So by measuring telomere length we have a way of estimating the biological age of an individual – how much of its life it has used up,” said David Richardson of the University of East Anglia.
The researchers tested the average telomere lengths of a population of 320 Seychelles Warblers living on the remote Cousin Island, which ornithologists have studied for 20 years, documenting the life history of each bird.
“Our results provide the first clear and unambiguous evidence of a relationship between telomere length and mortality in the wild, and substantiate the prediction that telomere length and shortening rate can act as an indicator of biological age further to chronological age,” says the study published in the journal Molecular Ecology.
Studying an island population of wild birds was important because there were no natural predators and little migration, meaning that the scientists could accurately study the link between telomere length and a bird’s natural lifespan.
“We wanted to understand what happens over an entire lifetime, so the Seychelles warbler is an ideal research subject. They are naturally confined to an isolated tropical island, without any predators, so we can follow individuals throughout their lives, right into old age,” Dr Richardson said.
“We investigated whether, at any given age, their telomere lengths could predict imminent death. We found that short and rapidly shortening telomeres were a good indication that the bird would die within a year,” he said.
“We also found that individuals with longer telomeres had longer life spans overall. It used to be thought that telomere shortening occurred at a constant rate in individuals, and that telomere length could act as an internal clock to measure the chronological age of organisms in the wild,” Dr Richardson said.
“However while telomeres do shorten with chronological age, the rate at which this happens differs between individuals of the same age. This is because individuals experience different amounts of biological stress due to the challenges and exertions they face in life. Telomere length can be used as a measure of the amount of damage an individual has accumulated over its life,” he added.



আলাউদ্দিন আরিফ
     
31
পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার পরই বিশ্বব্যাংক পুনঃঅর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেবে বলে অর্থমন্ত্রীকে জানিয়েছে বহুজাতিক এই দাতা সংস্থার সফররত দুর্নীতি তদন্ত দল। গতকাল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠকে এই মনোভাবের কথা জানায় বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে তদন্ত দলের বৈঠকের পর বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি অ্যালেন গোল্ডস্টেইন বলেছেন, দুদকের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণ পাওয়ার বিষয়টি। দুর্নীতিতে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া না হলে এবং দুদকের গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক গঠিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ প্যানেল আস্থা প্রকাশ না করলে এ প্রকল্পে অর্থ পাওয়া যাবে না।
গতকাল বিশ্বব্যাংকের তদন্ত দলের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেন, যে প্যানেল এসেছে তারা দেখবেন আমাদের তদন্ত প্রক্রিয়াটি বিশ্বাসযোগ্য ও উন্নত কিনা। যদি তারা দেখে যে, আমাদের তদন্ত প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানের, তখনই আমাদের ‘রি-এনগেজমেন্ট কমপ্লিট’ (পুনঃঅর্থায়নের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত) হবে।
এর আগে গতকাল বিশ্বব্যাংকের গঠিত বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে বৈঠকের পর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন বলেন, দুদকের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা। দুর্নীতিতে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া হলে এবং দুদকের গৃহীত পদক্ষেপের ওপর বিশ্বব্যাংক গঠিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ প্যানেল আস্থা প্রকাশ না করলে এই প্রকল্পে অর্থ পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, দুদককে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই প্রকল্পকে বাস্তবে পরিণত করার বিষয়টি এখন দুদকের হাতে। আমরা আশা করছি, দুদক সফলতার সঙ্গে কাজটি বাস্তবায়ন করবে।
এদিকে দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে কানাডিয়ান পুলিশের কাছ থেকে এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে কানাডার আদালতে করা মামলার এজাহার, আদালতের আদেশের কপি ও সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিষয়ে আরও কিছু নথিপত্র হাতে পেয়েছে দুদক, যা এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দুদকের পুনঃতদন্তে প্রাপ্ত তথ্য, জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও সিডি ও অন্যান্য নথিপত্র তাদের দেয়া হয়েছে। এখন তারা সেগুলো পর্যালোচনা করছেন। তবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংকের প্যানেল চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কমিটির সদস্যরা প্যানেলের অনেক প্রশ্নেরও সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। প্যানেলের সদস্যরা এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে তদন্তের জন্য দুদকের কর্মকর্তাদের উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণ নেয়ার বিষয়েও বলেছেন।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি বিষয়ে দুদকের তদন্ত পর্যবেক্ষণের জন্য অক্টোবরে প্যানেল অব এক্সপার্ট গঠন করে বিশ্বব্যাংক। এই টিমের তিন সদস্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পো, হংকংয়ের দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং ও যুক্তরাজ্যের গুরুতর প্রতারণা দমন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান গত ১৫ অক্টোবর প্রথম দফায় বাংলাদেশে আসেন। ওই সময় দু’বার দুদকের সঙ্গে বৈঠক করে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসার ঘোষণা দিয়ে ফিরে যান। যাওয়ার আগে তারা পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুদকের অনুসন্ধান আবার নতুন করে করার পরামর্শ দিয়ে যান। সে অনুযায়ী গত দেড় মাস ধরে দুদক বিষয়টি আবার তদন্ত করে। গত শনিবার রাতে প্যানেলের তিন সদস্য দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশে আসেন। গতকাল বেলা ৩টা ১০ মিনিটে তারা দুদকের প্রধান কার্যালয়ে যান। এক ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠক শেষে ফিরে যান বেলা ৪টা ২২ মিনিটে। বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যালেন গোল্ডস্টেইন ও বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ বিষয়ক আইন উপদেষ্টা প্রিরানী মালিক। বৈঠকে অনুসন্ধান টিমের চার সদস্য, দুদকের তিন কমিশনার ও কমিশনের আইন উপদেষ্টা অংশ নেন। গতকালের বৈঠকে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্যরা অনুসন্ধান দলের সঙ্গে বেশ কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে তারা আরও কিছু বিষয় বাদ দেয়া ও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিশেষজ্ঞ টিমের দ্বিতীয় দফা আগমনের আগেই যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েছিল দুদক। দ্বিতীয় ধাপে আবার জিজ্ঞাসাবাদে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তার প্রতিবেদনের ইংরেজি ভার্সন ও আনুষঙ্গিক নথিপত্র তৈরি করে রাখা হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদনে অনুসন্ধান টিম দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ১৫ ব্যক্তিকে আসামি হিসেবে শনাক্ত করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন— সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, পদ্মা সেতুর সাবেক প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় ও হুইফ লিটন চৌধুরীর ভাই নিক্সন চৌধুরী, টেন্ডার কমিটির সদস্য সচিব সওজের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী ফেরদৌস, এসএনসি-লাভালিনের স্থানীয় এজেন্ট জিয়াউল হক ও গোলাম মোস্তফা। অনুসন্ধান দল আজ সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করবে। দু-একদিনের মধ্যেই সেটা কমিশনের কাছে পেশ ও সে অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে গতকাল কমিশনের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের বৈঠকের পর বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি অ্যালেন গোল্ডস্টেইন সাংবাদিকদের বলেন, ‘পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি বিষয়ে দুদকের আবার তদন্তের বিষয়ে পর্যবেক্ষণের জন্য এই বৈঠক করেছেন। প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়ার জন্য দুর্নীতির অভিযোগগুলোর অবাধ ও সুষ্ঠু তদন্ত খুবই জরুরি।’ তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত অনুসন্ধান সম্পর্কে আমরা যা জেনেছি, তা উত্সাহব্যঞ্জক। আগামী কয়েক দিনে আমরা আরো কয়েক দফা বৈঠক করব। যদি যথেষ্ট অগ্রগতি দেখা যায়, তাহলে এই সেতু নির্মাণ সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।’
পদ্মা প্রকল্পের বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণে গত সপ্তাহে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর বৈঠকের অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গোল্ডস্টেইন বলেন, ‘কয়েকদিন আগে ম্যানিলায় একটি বৈঠক হয়েছে। সেটা ছিল প্রাথমিক পর্যালোচনা বৈঠক। সেখানে পদ্মা সেতু প্রকল্প আবার কীভাবে শুরু করা যায় সে বিষয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে।’
আপনারা দুদকের তদন্তে সন্তুষ্ট হয়েছেন কিনা এবং অর্থায়ন করতে যাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে গোল্ডস্টেইন বলেন, ‘এটা নির্ভর করছে দুদকের ওপর। দুদককে অবশ্যই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই প্রকল্পকে বাস্তবে পরিণত করার বিষয়টি এখন দুদকের হাতে। আমরা আশা করছি, দুদক সফলতার সঙ্গে কাজটি বাস্তবায়ন করবে।’ বিশ্বব্যাংকের এই প্যানেল ঢাকা ত্যাগের আগে অর্থায়নের বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে গোল্ডস্টেইন বলেন, এটা বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস থেকে পরে জানানো হবে।’
জানা গেছে, গত বুধবার পদ্মা সেতুর অর্থায়নে সম্পৃক্ত বিশ্বব্যাংক ও অপর তিনটি দাতা সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপনের জন্য সর্বাত্মক সহায়তা চাওয়া হয়েছে। ওই সভায় দাতা সংস্থাগুলো সাতটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে এবং সেগুলো মেনে চলার বিষয়ে বাধ্যবাধকতাও আরোপ করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য মতে, ওই শর্ত মানার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অনাপত্তি দেয়া হয়েছে। শর্তের মধ্যে ছিল, সেতু নির্মাণে সর্বত্রই অর্থদাতাদের বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের প্রাধান্য থাকবে।
বিশ্বব্যাংক দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন এবং কার্যাদেশ প্রদানের মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে। তবে এ সংক্রান্ত কমিটিতে বাংলাদেশ সরকারেরও প্রতিনিধি রাখা হবে। দুর্নীতি তদন্তে দুদকের ওপর সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। তদন্ত চলবে সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রক্রিয়ায়। বিশ্বব্যাংক যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে, তার সবই আমলে নেবে সরকার। গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পেলে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে সরকারের আপত্তি থাকবে না।
এদিকে বিশ্বব্যাংকের প্যানেল দুদক কার্যালয় ত্যাগ করার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছেন, ‘আমরা এই ক’দিনে যে কাজ করেছি তার একটি বর্ণনা বিশেষজ্ঞ কমিটিকে দিয়েছি। আমাদের বর্ণনাতে তারা মোটামুটি সন্তুষ্ট হয়েছে। আমাদের অনুসন্ধান কাজ এখনও শেষ হয়নি। সোমবার সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর ‘সাক্ষাত্কার’ আমরা নেব। তাদের সাক্ষাত্কারের পর আমাদের অনুসন্ধান টিম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। তার ভিত্তিতে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থার চিন্তা করব।’
বিশ্বব্যাংকের প্যানেল মামলা বা ত্বরিত কোনো আইনি পদক্ষেপের কথা বলেছে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘মামলা তো হবে যখন অনুসন্ধান টিমের প্রতিবেদনে কারও বিরুদ্ধে অপরাধের বিষয়ে দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যাবে তারপর। অনুসন্ধান প্রতিবেদন বিচার-বিশ্লেষণের আগে এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না।’ বিশ্বব্যাংকের টিম দুদককে কার্যকরভাবে কাজ করতে বলেছে এবং পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন দুদকের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘তারা কার্যকরভাবে বলুক আর যাই বলুক, আমরা পদক্ষেপ নেব আইনানুগ। সেটা সম্ভব হবে কি হবে না, সেটা জানা যাবে অনুসন্ধান প্রতিবেদন পাওয়ার পর।
‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’ তার এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গোলাম রহমান বলেন, “আমরা আগে যে তথ্য পেয়েছি তার ভিত্তিতে ওই কথা বলেছি। এখন সেই তথ্য কতটুকু সঠিক সেটা নিশ্চিত হওয়া যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করার পর। ওইসব ‘কালা’ বিষয়ের পক্ষে প্রমাণাদি পাওয়ার পরই সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
বিশ্বব্যাংক দুদকে অনেক তথ্য দিয়েছে। কিন্তু সেগুলো মামলা করার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘মামলা করার জন্য যে দালিলিক নথিপত্র প্রয়োজন সেটা এখনও পাওয়া যায়নি। বিশ্বব্যাংক যে তথ্য দিয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত তথ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না। আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় যে প্রক্রিয়ায়, সে প্রক্রিয়ায় আমরা তথ্য পাইনি। সেটা পাওয়ার জন্যই পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।’
এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তা রমেশ ও ইসমাইলের বক্তব্য নেয়া হয়নি; এতে অনুসন্ধান অসম্পূর্ণ থাকবে কিনা এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘রমেশ ও ইসমাইলের কোনো বক্তব্য আমরা পাইনি। পরবর্তীতে তদন্তে প্রয়োজন হলে তাদের বক্তব্য নেয়া যাবে। তাদের বক্তব্য নেয়ার জন্য কানাডায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেই চিঠির (এমএলআর) কোনো সন্তোষজনক রিপ্লাই পাওয়া যায়নি।’ অনুসন্ধান চলমান থাকার কথা উল্লেখ করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘দুর্নীতির অনুসন্ধান কখনও শেষ হয় না। সেটা চলমান থাকে। যখনই তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে তখনই সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
দুদকের প্রধান আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির যে অভিযোগ বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পেয়েছি, বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পরামর্শের আলোকে গত ১৮ অক্টোবর থেকে তার একটি ফ্রেশ তদন্ত হয়েছে। আমাদের সময়ের সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা চেষ্টা করেছি দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করার। গত ১৮ অক্টোবর থেকে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। আজও হয়েছে। আগামীকালও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এসবের অগ্রগতি জানার জন্যই তারা এসেছেন। সেই জিজ্ঞাসাবাদের পর ৪ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) আমরা প্যানেলের সঙ্গে পুনরায় বসব। প্রাপ্ত তথ্যাদি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করব।’
প্যানেল মামলা করার কোনো পরামর্শ দিয়েছে কিনা এই প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, মামলা করা না করা সেটা তাদের বিষয় নয়। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে যদি আমাদের আইনে কোনো অপরাধ পাওয়া যায় অবশ্যই মামলা হবে।
আজ সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ সময় বিশেষজ্ঞ প্যানেল থাকবে কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে আনিসুল হক বলেন, সরকারের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে— সেখানে বলা আছে, যাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে প্যানেলের সদস্যরা থাকতে পারবেন। যেহেতু তাদের আগামীকাল (আজ) জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, আর এই দিন তারা দুদকে আসবেন না। আগামী চার তারিখ বেলা ৩টার পর তারা কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
জামিলুর রেজা ও সফিউল্লাকে জিজ্ঞাসাবাদ : পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে মূল্যায়ন কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধরী ও সদস্য বুয়েটের সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আমম সফিউল্লাহকে গতকাল ফের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে অনুসন্ধান টিম। মূল্যায়ন কমিটির অপর সদস্য ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত জলবায়ু সম্মেলনে কাতারের রাজধানী দোহায় থাকায় তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।
জামিলুর রেজা চৌধুরী ও প্রকৌশলী ড. সফিউল্লাহ দুদকের প্রধান কার্যালয়ে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় তাদের কমিশনের ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
অনুসন্ধান টিম সূত্রে জানা গেছে, মূল্যায়ন কমিটির অপর সদস্য ড. আইনুন নিশাতের কাছ থেকে যেসব তথ্য জানা প্রয়োজন সেগুলো ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ও ড. সফিউল্লার কাছ থেকে পাওয়া গেছে। তাই ড. আইনুন নিশাতকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন নেই।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুর দিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ তোলে বিশ্বব্যাংক। সরকারকে দেয়া ওই চিঠির অনুলিপি দুদককেও দেয়া হয়েছে। দুদকের সিনিয়র উপ-পরিচালক আবদুল্লাহ আল জাহিদ ও মীর জয়নুল আবেদিন শিবলীর নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের তদন্ত টিম দুর্নীতির অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন। অনুসন্ধান শেষে এ মাসেই দুদকের টিম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে এবং সে অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক।
দুদক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রস্তাব বিশেষজ্ঞ প্যানেলের : দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে চায় বিশ্বব্যাংক। এ ক্ষেত্রে কমিশনের সম্মতি পাওয়া গেলে বিশ্বব্যাংকের গঠিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হতে পারে।
জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক চলতি বছরের অক্টোবরে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্যানেল গঠন করে। তারা গত ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফরে আসেন। তারা দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের কর্মপদ্ধতি, কর্মকৌশল ও পন্থা বিষয়ে ব্যাপক আপত্তি তোলেন। তারা একটি গাইডলাইন দিয়ে সে অনুযায়ী পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি ফের অনুসন্ধানের পরামর্শ দেন। কিন্তু সে গাইডলাইন অনুযায়ী অনুসন্ধান কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় অনেকটাই আশাহত হয়েছেন প্যানেলের সদস্যরা। তাই তারা দুদকের অনুসন্ধান দলের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় কিছু প্রশিক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন।
কমিশনের সম্মতি পাওয়া গেলে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পো, হংকংয়ের দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং ও যুক্তরাজ্যের গুরুতর প্রতারণা দমন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান এই প্রশিক্ষণ দিতে পারেন।
প্রশিক্ষণ নেয়ার পরামর্শ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক কমিশনার শাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা আমাদের প্রস্তাব করেছেন, দুদক চাইলে তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নও করতে চায় বিশ্বব্যাংক।
পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অনুসন্ধানে ঘাটতি ও অসম্পূর্ণতা থাকায় বিশ্বব্যাংকের প্যানেল এ ধরনের প্রস্তাব করেছে কিনা জানতে চাইলে কমিশনার শাহাবুদ্দীন বলেন—না, ব্যাপারটি ঠিক সে রকম নয়। তারা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এ কাজটি করার জন্য প্রস্তাব করেছেন। বিষয়টি কমিশন ভেবে দেখবে।

About